উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগের অন্যতম আস্থার প্রতীক হলো দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস। আপনি যদি ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী এবং এর সর্বশেষ ভাড়ার তালিকা খুঁজে থাকেন, তবে আপনি একদম সঠিক জায়গায় এসেছেন। সান্তাহার থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম (পঞ্চগড়) রুটে যাতায়াতকারী এই ট্রেনটি কেবল একটি পরিবহন নয়, বরং হাজারো মানুষের প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততা আর আবেগের নাম।
সঠিক সময়ে স্টেশনে পৌঁছানো এবং টিকিটের ঝামেলামুক্ত ভ্রমণ নিশ্চিত করতে এই ট্রেনের প্রতিটি খুঁটিনাটি তথ্য জানা জরুরি। বর্তমান সময়ে রেলওয়ের ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়লেও অনেক সময় তথ্যের সঠিক সমন্বয় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই যাত্রীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে আমরা এই আর্টিকেলে দোলনচাঁপা এক্সপ্রেসের সময়সূচী, স্টপেজ এবং টিকিট বুকিংয়ের সম্পূর্ণ গাইড সাজিয়েছি।
দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী জানা আপনার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? সাধারণত উত্তরবঙ্গের যাত্রীরা যারা সান্তাহার, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর এবং দিনাজপুর হয়ে পঞ্চগড় পর্যন্ত ভ্রমণ করেন, তাদের কাছে এই ট্রেনটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর মধ্যে অন্যতম নির্ভরযোগ্য এবং সময়ানুবর্তী একটি সার্ভিস।
বিগত কয়েক বছরে এই রুটে যাত্রীর চাপ কয়েক গুণ বেড়েছে। ফলে আগেভাগে সময়সূচী না জানলে স্টেশনে গিয়ে টিকিট না পাওয়া কিংবা ট্রেন মিস করার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে। দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস (ট্রেন নং ৭৬৭/৭৬৮) তার আধুনিক কোচ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশের জন্য নিয়মিত যাত্রীদের কাছে প্রথম পছন্দ। আপনি যদি একজন শিক্ষার্থী, সরকারি চাকুরিজীবী কিংবা পর্যটক হন—এই ট্রেনের শিডিউল আপনার পকেটে রাখা মানেই হলো টেনশনমুক্ত একটি যাত্রা।
দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী (আপডেট ২০২৬)
২০২৬ সালের সর্বশেষ রেলওয়ে গাইড অনুযায়ী দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস প্রতিদিন তার নির্দিষ্ট রুটে চলাচল করে। মনে রাখবেন, এই ট্রেনটির কোনো সাপ্তাহিক বন্ধ নেই, অর্থাৎ সপ্তাহের ৭ দিনই আপনি এই ট্রেনে ভ্রমণ করতে পারবেন। নিচে এর যাতায়াতের সময়সূচী দেওয়া হলো:
ট্রেন নং
রুট (প্রস্থান ⇄ গন্তব্য)
ছাড়ার সময়
পৌঁছানোর সময়
ছুটির দিন
৭৬৭
সান্তাহার টু বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম
১১:০০
২০:২০
নাই
৭৬৮
বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম টু সান্তাহার
০৭:২০
১২:৩০
নাই
সতর্কতা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা যান্ত্রিক কারণে মাঝেমধ্যে ১০-১৫ মিনিট সময়ের হেরফের হতে পারে। তাই ট্রেন ছাড়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে স্টেশনে উপস্থিত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস ট্রেনের বিরতি স্টেশন ও সময়সূচী
একটি আন্তঃনগর ট্রেন হিসেবে দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস পথে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। আপনি যদি মাঝখানের কোনো স্টেশন থেকে উঠতে চান বা নামতে চান। তাহলে এই বিরতি স্টেশনগুলোর সময়সূচী জানা আপনার জন্য আবশ্যক। বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর ও দিনাজপুরের মতো বড় স্টেশনগুলোতে এই ট্রেনটি থামে। নিচে দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস ট্রেনের বিরতি স্টেশন ও সময়সূচী ছক আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে:
স্টেশনের নাম
সান্তাহার থেকে (৭৬৭) পৌঁছানোর সময়
বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম থেকে (৭৬৮) পৌঁছানোর সময়
তালোড়া
১১:২৩
—
বগুড়া
১১:৪৯
১৪:৪০
সোনাতলা
১২:৪০
—
মহিমাগঞ্জ
—
—
বোনারপাড়া
১৩:০৪
১৪:৩৪
বাদিয়াখালী
১৩:১৮
১৪:০৫
গাইবান্ধা
১৩:৩৫
১২:৪২
বামনডাঙ্গা
—
—
পীরগাছা
—
—
কাউনিয়া
১৪:৫৫
১০:৫৫
রংপুর
১৫:৪২
১০:২৬
বদরগঞ্জ
—
—
খোলাহাটি
—
—
পার্বতীপুর
১৬:৪০
০৯:১৫
চিরিরবন্দর
১৭:২০
—
দিনাজপুর
১৯:৪২
০৮:২৮
পীরগঞ্জ
১৮:৪৮
০৭:২৫
ভোমরাদহ
১৯:০০
০৭:১৩
ঠাকুরগাঁও
১৯:২০
০৬:৫১
(দ্রষ্টব্য: ছকে দেওয়া সময়গুলো আনুমানিক ও রেলওয়ের সময়সূচির উপর নির্ভর করে সামান্য পরিবর্তন হতে পারে। ট্রেন ছাড়ার অন্তত ২০ মিনিট থেকে ৩০ মিনিট আগে স্টেশনে পৌঁছানো বুদ্ধিমানের কাজ।)
ট্রেনটির রুট ও স্টপেজ (বিরতি স্টেশন)
দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস যাত্রাপথে উত্তরবঙ্গের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও উপজেলায় থামে। আপনি যদি নির্দিষ্ট কোনো স্টেশন থেকে উঠতে চান, তবে নিচের স্টপেজগুলো খেয়াল করুন:
বগুড়া জেলা: তালোড়া এবং বগুড়া মেইন স্টেশন।
গাইবান্ধা জেলা: সোনাতলা, মহিমাগঞ্জ (কিছু ক্ষেত্রে), বোনারপাড়া এবং গাইবান্ধা সদর।
রংপুর বিভাগ: বামনডাঙ্গা, পীরগাছা, কাউনিয়া এবং রংপুর স্টেশন।
দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও: পার্বতীপুর, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর সদর, পীরগঞ্জ এবং ঠাকুরগাঁও রোড।
সর্বশেষ গন্তব্য: বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম (পঞ্চগড়)।
এই বিরতি স্টেশনগুলোর মাধ্যমে ট্রেনটি উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সাথে বিভাগীয় শহরের সংযোগ স্থাপন করে।
দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস ট্রেনের ভাড়া তালিকা
ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেলওয়ে দূরত্বের পাশাপাশি সিটের মানকে গুরুত্ব দেয়। দোলনচাঁপা এক্সপ্রেসে মূলত তিন ধরনের সিট ক্যাটাগরি রয়েছে। ২০২৬ সালের আপডেট ভাড়ার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
শোভন (Shovon): ৩৪০ টাকা (সাধারণ ভ্রমণের জন্য সাশ্রয়ী)।
শোভন চেয়ার (Shovon Chair): ৪০৫ টাকা (দীর্ঘ যাত্রার জন্য আরামদায়ক এবং জনপ্রিয়)।
প্রথম সিট/স্নিগ্ধা (Snigdha): ৬২১ টাকা (এসি কামরা ও প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতা)।
কোনটি আপনার জন্য ভালো? আপনি যদি কম খরচে যেতে চান তবে শোভন চেয়ার সবথেকে ভালো বিকল্প। কারণ এটি দীর্ঘ সময় বসে থাকার জন্য বেশ উপযোগী এবং এর ভাড়াও সাধ্যের মধ্যে। তবে বয়স্ক বা অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এসি বা স্নিগ্ধা ক্লাস বেছে নেওয়া ভালো।
এই ট্রেনটি আপনার জন্য কতটা ভালো?
দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস কেন অন্য লোকাল বা মেইল ট্রেনের চেয়ে আলাদা? এর উত্তর হলো এর নিরাপত্তা ও গতি।
শিক্ষার্থীদের জন্য: যারা রংপুর বা দিনাজপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি কলেজে পড়াশোনা করেন, তাদের জন্য এই ট্রেনের সময়সূচী একদম পারফেক্ট।
পারিবারিক ভ্রমণ: পরিবারের সদস্য এবং শিশুদের নিয়ে যাতায়াতের জন্য ট্রেনের বগিগুলো বেশ প্রশস্ত এবং নিরাপদ।
ব্যবসায়ীদের জন্য: সান্তাহার বা বগুড়া থেকে মালামাল আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে বা দ্রুত যাতায়াতে ব্যবসায়ীরা এই ট্রেনকে অগ্রাধিকার দেন।
টিকিট কাটার সম্পূর্ণ গাইড
বর্তমানে টিকিট কাটার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়েছে। আপনি তিনটি উপায়ে টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন:
১. অনলাইন (Online Booking)
রেলওয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (eticket.railway.gov.bd) থেকে আপনি খুব সহজেই টিকিট কাটতে পারেন।
ওয়েবসাইটে লগইন করুন।
আপনার গন্তব্য ও তারিখ সিলেক্ট করুন।
পছন্দমতো সিট বেছে নিয়ে বিকাশ বা নগদে পেমেন্ট করুন।
ই-টিকিটটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিন অথবা ফোনে সেভ রাখুন।
২. কাউন্টার (Manual Booking)
আপনি যদি সরাসরি স্টেশন থেকে টিকিট কাটতে চান, তবে ট্রেন ছাড়ার অন্তত ২-৩ দিন আগে টিকিট কাটার চেষ্টা করুন। কারণ যাত্রার দিন কাউন্টারে টিকিটের সংকট হতে পারে।
৩. মোবাইল অ্যাপ (Rail Sheba)
স্মার্টফোনে ‘Rail Sheba’ অ্যাপ ডাউনলোড করে আপনি যেকোনো সময় ট্রেনের অবস্থান এবং টিকিট চেক করতে পারেন।
বাস্তব অভিজ্ঞতা
কল্পনা করুন, আপনি সকালে দিনাজপুর থেকে সান্তাহার যাওয়ার জন্য বের হয়েছেন। সকাল ৮:২৮ মিনিটে দিনাজপুর স্টেশনে দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস এসে থামলো। আপনি যদি ট্রেনের জানালার ধারের একটি সিট পান, তবে পুরো পথে উত্তরবঙ্গের সবুজ খেত আর গ্রামীণ সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। দুপুর ১২:৩০ নাগাদ আপনি সান্তাহার পৌঁছে যাবেন, যা আপনাকে দিনের বাকি অর্ধেক সময় কাজের সুযোগ করে দিবে। এই ট্রেনের বড় সুবিধা হলো এর স্থিতিশীলতা—অন্যান্য বাসের মতো হাইওয়েতে জ্যামের দুশ্চিন্তা এখানে নেই।
ভ্রমণের সময় গুরুত্বপূর্ণ টিপস
যাত্রাকে আনন্দদায়ক করতে নিচের টিপসগুলো মেনে চলুন:
আগে পৌঁছানো: বড় স্টেশনে ট্রেন আসার ২০ মিনিট আগেই সিটে গিয়ে বসুন।
শুকনো খাবার: ট্রেনের কেন্টিনে খাবার পাওয়া গেলেও নিজের সাথে পানির বোতল এবং হালকা শুকনো খাবার রাখা নিরাপদ।
পাওয়ার ব্যাংক: দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার যাত্রা হলে সাথে পাওয়ার ব্যাংক রাখুন, কারণ ট্রেনের চার্জিং পয়েন্ট সবসময় সচল নাও থাকতে পারে।
নিরাপত্তা: অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার খাবেন না এবং নিজের মালামাল সাবধানে রাখুন।
সাধারণ ভুল ও সমাধান
অনেকেই দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী দেখার সময় পুরনো ওয়েবসাইট বা পোস্ট দেখেন। এটি একটি বড় ভুল। সবসময় বর্তমান সালের (২০২৬) শিডিউল ফলো করুন। এছাড়া শেষ মুহূর্তের জন্য টিকিট ফেলে রাখবেন না। বিশেষ করে সরকারি ছুটির দিনে টিকিট অন্তত ১০ দিন আগেই বুক করে রাখা ভালো। যদি অনলাইনে টিকিট না পান, তবে স্ট্যান্ডিং টিকিট বা কাউন্টারে গিয়ে যোগাযোগ করুন।
FAQ (সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন)
১. দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস কি প্রতিদিন চলে?
হ্যাঁ, এটি সপ্তাহের ৭ দিনই চলাচল করে। এর কোনো সাপ্তাহিক বন্ধ নেই।
২. দোলনচাঁপা এক্সপ্রেসের অনলাইন টিকিট কিভাবে পাবো?
বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অথবা ‘Rail Sheba’ অ্যাপ ব্যবহার করে আপনি অনলাইন টিকিট কাটতে পারবেন।
৩. এই ট্রেনে কি এসি কোচ আছে?
হ্যাঁ, দোলনচাঁপা এক্সপ্রেসে স্নিগ্ধা বা এসি প্রথম সিটের ব্যবস্থা রয়েছে।
৪. দিনাজপুর থেকে সান্তাহার যেতে কত সময় লাগে?
সাধারণত ৪ ঘণ্টা থেকে ৪ ঘণ্টা ২০ মিনিট সময় লাগে।
শেষকথা
উপসংহারে বলা যায়, উত্তরবঙ্গের রেলপথে আরামদায়ক এবং নিরাপদ ভ্রমণের জন্য দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস একটি আস্থার নাম। আমরা চেষ্টা করেছি ২০২৬ সালের সর্বশেষ দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী এবং আনুষঙ্গিক সকল তথ্য আপনার সামনে তুলে ধরতে। সঠিক সময়ে টিকিট কেটে এবং নিয়ম মেনে ভ্রমণ করলে আপনার যাত্রা হবে স্মৃতিময়।
আপনার কি এই ট্রেন সম্পর্কে আরও কিছু জানার আছে? অথবা কোনো ফিডব্যাক দিতে চান? তবে নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানান। আপনার বন্ধুদের সাথে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি শেয়ার করুন যাতে তারাও উপকৃত হতে পারে। ধন্যবাদ আমাদের সাথে থাকার জন্য। শুভ যাত্রা!
আমাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা কম বেশি এগারো সিন্ধুর গোধুলি ট্রেনের সময়সূচি অনলাইনে অনুসন্ধান করে থাকেন। ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ রুটে যাতায়াতকারী যাত্রীদের কাছে…
প্রবাল এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী বা ভাড়া সম্পর্কে আপনি কি জানতে চান? আমাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা প্রবাল এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কে জানার জন্য অনলাইনে অনুসন্ধান…